
গোলাম মরতুজা, কোটালীপাড়া: একটি সড়ক দুর্ঘটনায় একসঙ্গে নিভে গেছে সাতটি জীবনের প্রদীপ। মাদারীপুরে বাস–ইজিবাইক সংঘর্ষে নিহত সাতজনের মধ্যে পাঁচ নারী দিনমজুরের মরদেহ নিজ গ্রামে পৌঁছানোর পর স্বজনদের আহাজারিতে শোকস্তব্ধ হয়ে উঠেছে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার পাইকের বাড়ি গ্রাম। কান্না, হাহাকার আর নিস্তব্ধতায় পুরো এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোক।
মাদারীপুরের এই মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত পাঁচ নারী দিনমজুরই কোটালীপাড়া উপজেলার সাদুল্লাপুর ইউনিয়নের পাইকের বাড়ি গ্রামের একই বাড়ির বাসিন্দা। তারা সবাই পরস্পরের আত্মীয়। একটি দুর্ঘটনায় একসঙ্গে পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যদের হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে স্বজনরা।
মাদারীপুর সদর থানা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রবিবার (১৮ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় মাদারীপুর সদর উপজেলার ঘটকচর মিলগেট এলাকায় সার্বিক পরিবহনের একটি বাস একটি ইজিবাইককে চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই ইজিবাইকের চালক, ইজিবাইকের পাঁচ যাত্রী এবং বাসের এক হেলপার নিহত হন।
ইজিবাইকে থাকা নিহত পাঁচ যাত্রী হলেন— কোটালীপাড়া উপজেলার পাইকের বাড়ি গ্রামের রনজিত বাড়ৈর স্ত্রী শেফালী বাড়ৈ (৪২), পংকজ বিশ্বাসের স্ত্রী কামনা বিশ্বাস (৪১), পলাশ বাড়ৈর স্ত্রী দুলালী বাড়ৈ (৪৫), প্রকাশ বাড়ৈর স্ত্রী আভা বাড়ৈ (৫০) এবং জয়ন্ত বাড়ৈর স্ত্রী অনিতা বাড়ৈ (৪০)।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) সকালে পাইকের বাড়ি গ্রামের বাড়ৈ বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে পাঁচটি মরদেহ। স্বজনদের বিলাপ আর প্রতিবেশীদের কান্নায় সেখানে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। কেউ মা হারিয়ে দিশেহারা, কেউ স্ত্রী হারিয়ে বাকরুদ্ধ—কারও চোখে নেই ভবিষ্যতের কোনো পথনকশা।
নিহত দুলালী বাড়ৈর দেবর বিপুল বাড়ৈ বলেন, “সংসারের স্বচ্ছলতার জন্য তারা ভোরের আলো ফোটার আগেই জীবিকার তাগিদে পাশ্ববর্তী মাদারীপুর জেলায় কাজে যেতেন। সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত কাজ করে সাধারণত সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ফিরতেন। কিন্তু রবিবার অতিরিক্ত কাজ থাকায় বিকেল ৫টা পর্যন্ত কাজ শেষে সন্ধ্যায় ইজিবাইকে করে ফেরার সময় এই দুর্ঘটনা ঘটে।”
পাইকের বাড়ি গ্রামের ইউপি সদস্য অখিল ওঝা বলেন, “দুর্ঘটনার খবর পেয়ে রবিবার রাতেই আমি মাদারীপুরে ছুটে যাই। রাত ২টার দিকে লাশগুলো নিয়ে গ্রামে ফিরি। পুরো এলাকাবাসী আজ শোকাহত। পরিবারগুলো এমনিতেই দরিদ্র ছিল। এই মর্মান্তিক মৃত্যুতে তারা সম্পূর্ণভাবে নিঃস্ব হয়ে গেছে। সরকারের কাছে জোর দাবি জানাই—এই অসহায় পরিবারগুলোর পাশে যেন দ্রুত সহায়তা নিয়ে দাঁড়ানো হয়।”
একটি দুর্ঘটনায় একসঙ্গে পাঁচ নারী শ্রমজীবীর প্রাণহানিতে পাইকের বাড়ি গ্রাম আজ শুধু শোক নয়, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কায়ও ভারী হয়ে আছে।