মংহাই থুই মারমা, জেলা প্রতিনিধি, বান্দরবান: পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় অর্থায়নে ৩ কোটি টাকার ফলদ ও বনজ চারা বিতরণ প্রকল্প হাতে নেয় বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ। পরে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য দায়িত্ব পান বান্দরবান হলটিকালচার উইং। কাগজে কলমে নামমাত্র চারা বিতরণ দেখিয়ে সরকারি এই প্রকল্পের সিংহভাগ বরাদ্দের অর্থ মিলেমিশে লোপাট করা প্রমাণে নথি পাওয়া গেছে। এতে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে বান্দরবান হলটিকালচার উইং এর উপপরিচালক লিটন দেবনাথ বিরুদ্ধে।
এছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় অর্থায়নে ফলদ ও বনজ চারা বিতরণ এই প্রকল্পে আরও দু'জন সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। তাঁরা হলেন - বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য ও কৃষি সম্প্রসারণ, হলটিকালচার উইং-এর আহ্বায়ক রেভা. লালজার লম বম এবং জেলা পরিষদের সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী লেলিন চাকমা।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, এই প্রকল্প মাধ্যমে বান্দরবানে কৃষকরা সুফল পাননি। এছাড়াও বিতরণ করা অধিকাংশ চারা নষ্ট ও রোপণের অযোগ্য ছিল। এছাড়া সরেজমিনে ফলদ ও বনজ চারা বিতরণ প্রকল্পের আওতায় কোনো দৃশ্যমান কোন প্রদর্শনী দেখা যায়নি। যা কাগজে কলমে হিসাব ঠিক রেখে বরাদ্দের সিংহভাগ অর্থ মিলেমিশে লোপাট করা হয়েছে।
এই ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনকে দ্রুত তদন্তে নামার তাগিদ দিয়েছেন বান্দরবানে সচেতন মহল। তাদের মতে, তদন্ত হলে প্রকল্পের নামে কোটি কোটি সরকারি বরাদ্দে অর্থ আত্মসাতের সত্যতা বেরিয়ে আসবে।
নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক থানচির এক কৃষক অভিযোগ করে বলেন, হঠাৎ একদিন বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের কিছু লোক এসে আমাদের হাতে কিছু চারা ধরিয়ে ছবি তোলে, এরপর তাঁরা চলে গেল। কিন্তু এগুলো কোন জমিতে লাগাব, কত দূরে দূরে রোপণ করব, কীভাবে পরিচর্যা করব কিছুই জানাইনি। অজ্ঞতার কারণে সব চারা রোপণ করা পর শুকিয়ে মরে গেছে।
নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক রোয়াংছড়ির এক নারী কৃষক জানান, প্রশিক্ষণ পেলে আমরা হয়তো চারা সঠিক পদ্ধতিতে রোপণ করতে পারতাম। কিন্তু এখন এগুলো কোনো কাজে আসেনি। শুধু শুধু সরকারি অর্থ নষ্ট করেছে প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা কর্মকতারা।
নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক উপজেলা একজন কৃষি কর্মকর্তা বলেন, এইসব বড় প্রকল্প কাজে দায়িত্ব নিবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। কারণ আমাদের জনবল সংকট নাই, আমাদের লোকবল আছে।এছাড়াও কৃষকদের সঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে যোগাযোগটা গভীরে। কেন হলটিকালচারে হাতে এ প্রকল্পটি বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ দিয়েছে সেটা আমি জানি না। প্রকল্পটি আসলে পানিতে গেছে।
নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক বান্দরবান জেলা পরিষদের একজন কর্মকর্তা বলেন, সবকিছুর দায় ফলদ ও বনজ প্রকল্পের বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এড়াতে পারেন না। এসব প্রকল্প কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হাতে দেয়া উচিত ছিল। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানে কোন গাছের চারায় কৃষকরা কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করবে, কোন সার প্রয়োগ করবে।
বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, প্রকল্পের বাজেট ছিল ৩ কোটি টাকা। কিন্তু এর মধ্যে আনুমানিক মাত্র ১ কোটি টাকার মতো চারা কিনেছে। বাকী প্রায় ২কোটির অধিক টাকা ভুয়া বিভিন্ন ফলদ ও বনজ চারা বিল-ভাউচার দেখিয়ে লোপাট করা হয়েছে। এক কথায় কাগজে কলমে হিসাব ঠিক রেখে সরকারি প্রকল্পের বরাদ্দ টাকা লোপাট করে ফেলা হয়েছে।
প্রকল্প বিশেষজ্ঞ কৃষিবিদ মোহাম্মদ আবির ইসলাম বলেন, হলটিকালচার উইং-এর জনবল সংকট রয়েছে। এটা সবাই জানে। পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা তাদের পক্ষে কোনভাবে সম্ভব না। এসব কৃষি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গেলে জনবল আর সার্বক্ষণিক তদারকি প্রয়োজন। বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানে উচিত তাদেরকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেয়া।
বান্দরবান শহরের সচেতন নাগরিকরা এ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, রাষ্ট্রীয় অর্থ এভাবে নষ্ট হওয়া দেশের জন্য বড় ক্ষতি।
বান্দরবান সচেতন নাগরিক উসাইন বলেন, কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এটি দুর্নীতির প্রকল্পে পরিণত হয়েছে আপনার মাধ্যমে জানলাম। এই ঘটনায় দুদককে মাঠে নেমে দ্রুত তদন্ত শুরু করতে হবে।
সম্পাদক : শেখ মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন, গোপালগঞ্জ সদর, গোপালগঞ্জ।
অফিস: ০২-৪৭৯৯৬১৪১, মোবাইল: ০১৯১১-৩৩২১৮৫, ইমেইল: mahbubpress66@gmail.com