
যুগকথা রিপোর্টঃ
গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার পাটগাতী ইউনিয়নের গওহরডাঙ্গা সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে গ্রাহকদের পানির বিল জমা হওয়ার নিয়ম থাকলেও, আদায়কৃত টাকার সিংহভাগই জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পকেটে যাচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এতে একদিকে যেমন সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত সংযোগ দেওয়ায় তীব্র পানি সংকটে ভুগছেন প্রায় ৯০০ পরিবারের সদস্যরা।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) অধীনে এলাকার মানুষের সুপেয় পানির চাহিদা মেটাতে ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্ল্যান্টটি নির্মাণ করা হয়। ২০২৪ সালের জুনে নির্মাণকাজ শেষ হলেও পানি সরবরাহ শুরু হয় ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, প্ল্যান্ট চালুর প্রথম দুই বছর এর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার যাবতীয় ব্যয় বহন করবে নির্মাণকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এই সময়ে গ্রাহকদের মাসিক বিল পাটগাতী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের যৌথ ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হওয়ার কথা। দুই বছর পর ইউনিয়ন পরিষদের কাছে হস্তান্তরের পর এই জমানো অর্থ দিয়েই প্ল্যান্টের স্থায়ী রক্ষণাবেক্ষণ করার বিধান রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে প্ল্যান্টটির আওতাভুক্ত প্রায় ৯০০ গ্রাহকের মধ্যে মাত্র ৮০ থেকে ১০০ জন সরাসরি বেসিক ব্যাংকের নির্ধারিত অ্যাকাউন্টে বিল জমা দেন। বাকি অন্তত ৮০০ গ্রাহকের কাছ থেকে নগদে টাকা আদায় করা হচ্ছে। গত ১৪ মাসে এই বাবদ প্রায় ৩০ লাখ টাকা আদায়ের কথা থাকলেও ব্যাংকে জমা আছে মাত্র ৬ লাখ টাকার মতো। বাকি ২৪ লাখ টাকার কোনো হদিস মিলছে না। স্থানীয়দের অভিযোগ, টুঙ্গিপাড়া উপ-সহকারী প্রকৌশলী প্রদীপ মজুমদার এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশেই এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
পাটগাতী ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের সদস্য মোহাম্মদ রঞ্জু খান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “প্রকল্পের শুরু থেকেই আমরা নানা অনিয়ম দেখছি। তারা কতজন গ্রাহককে সংযোগ দিয়েছে তার কোনো সঠিক হিসাব আমাদের দেয় না। ৬০০ গ্রাহকের কথা বললেও বাস্তবে সংযোগ দেওয়া হয়েছে অনেক বেশি। গ্রাহকরা যখন বিল দেন, সেই টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে সরাসরি হাতে নেওয়া হচ্ছে। টাকা কেন ব্যাংকে যাচ্ছে না—এমন প্রশ্ন করলে তারা কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি। এছাড়া পানিতে সঠিক মাত্রায় ওষুধ মেশানো হচ্ছে না এবং ঘোলাটে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে।”
নিয়মিত বিল পরিশোধ করেও কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা। গ্রাহক মুরছালিন শেখ ও আলেয়া বেগম জানান, আগে প্রতিদিন পানি দেওয়া হলেও এখন একদিন পরপর পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। পানি ছাড়ার নির্দিষ্ট কোনো সময়সূচিও নেই। পানি জমিয়ে রাখার মতো বড় পাত্র না থাকায় দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে। তারা আরও জানান, মাসের বিল কখনো ব্যাংকে, আবার কখনো সরাসরি প্ল্যান্টে জমা দিতে বাধ্য হন তারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একদিন পরপর পানি সরবরাহের ফলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ টাকার বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয় হচ্ছে। সাশ্রয় হওয়া এই টাকার ভাগও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নিচ্ছেন।
এ বিষয়ে পাটগাতী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সুভাষ বিশ্বাস বলেন, “চুক্তি অনুযায়ী দুই বছর পর্যন্ত রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়মিত পানি সরবরাহের পূর্ণ দায়িত্ব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের। পানি একদিন পরপর কেন দেওয়া হচ্ছে, তা তারাই ভালো জানে। এখানে ইউনিয়ন পরিষদের কোনো নির্দেশনা কার্যকর হচ্ছে না।”
অন্যদিকে, অভিযুক্ত টুঙ্গিপাড়া উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী প্রদীপ মজুমদার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “বর্তমানে ব্যাংকে ৫ লাখ ৯ হাজার ৯২০ টাকা জমা আছে। সব গ্রাহক নিয়মিত বিল না দেওয়ায় জমার পরিমাণ কম। আর একদিন পরপর পানি দেওয়ার বিষয়টি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের নির্দেশনা অনুযায়ীই করা হচ্ছে।” তবে ২৪ লাখ টাকার গরমিলের বিষয়ে তিনি কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ বা ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
প্ল্যান্টটি উদ্বোধনের পর থেকেই দুর্নীতির এই চক্র সক্রিয় বলে দাবি এলাকাবাসীর। এই অনিয়ম ও লুটপাটের সুষ্ঠু তদন্তে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন গওহরডাঙ্গাবাসী।